আগে পূর্ণাঙ্গ ক্যাম্পাস, তারপর শিক্ষা কার্যক্রম

· Prothom Alo

পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি ছাড়া একের পর এক বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দিলেই যে উচ্চশিক্ষার বিস্তার ও শিক্ষার মান বাড়ে না; ক্যাম্পাস ছাড়া দেশের ২৫ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ই তার বড় উদাহরণ। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই কোনো স্থায়ী ক্যাম্পাস। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে উপাচার্য এবং কয়েকজন শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ফলে ভাড়া করা স্থাপনায় ও অন্য কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান চলছে। এমন যেনতেন পাঠদানে একদিকে যেমন বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় হচ্ছে; অন্যদিকে শিক্ষক, ল্যাবরেটরিসহ শিক্ষা সরঞ্জামের ঘাটতিতে শিক্ষার্থীরাও যথাযথ শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার নামে ‘ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে দেওয়ার’ এমন কর্মকাণ্ডের পেছনে রাজনৈতিক বিবেচনা ছাড়া আর কী থাকতে পারে, সেটা বোধগম্য নয়।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

দেশে বর্তমানে পাবলিক ও বেসরকারি মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা প্রায় ১৭৬; এর মধ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ৬০টি। কেননা, এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৪৫ লাখের বেশি। প্রতিবছর শ্রমবাজারে যে ২৪ থেকে ২৫ লাখ তরুণ প্রবেশ করছেন, তাঁদের বড় একটি অংশই বেকার থেকে যাচ্ছেন, আর উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করা তরুণদের মধ্যেই বেকারত্বের হার বেশি।

দুঃখজনক হলেও সত্যি, শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থানের সংযোগহীনতা যখন বেড়েছে, তখন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাও পাল্লা দিয়ে বেড়েছে। প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছে, ক্যাম্পাস গড়ে তোলার আগেই যে ২৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, তার ২৪টিই বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে অনুমোদন দেওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা এক। 

এই ২৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ছয়টি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, তিনটি কৃষি, চারটি চিকিৎসা এবং বিশেষায়িত ও অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় ১২টি। নিজস্ব ক্যাম্পাস, শিক্ষা ও গবেষণা অবকাঠামো এবং যোগ্য ও অভিজ্ঞ শিক্ষক ছাড়া এসব বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত হতে পারে না। আওয়ামী লীগ আমলে রাজনৈতিক বিবেচনায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি একের পর এক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েরও অনুমোদন দেওয়া হয়। শিক্ষার মান বৃদ্ধি ও উচ্চশিক্ষার বৈচিত্র্যমুখী বিস্তারের চেয়ে প্রভাবশালী নেতাদের আকাঙ্ক্ষাই অনেক ক্ষেত্রে বেশি কাজ করেছে। কেননা, নতুন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন মানেই জমি অধিগ্রহণ থেকে শুরু করে অবকাঠামো নির্মাণ, জনবল নিয়োগসহ স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে। এ ছাড়া দলীয় বিবেচনায় উপাচার্য নিয়োগের কারণে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতিরও যে সুযোগ তৈরি হয়, তার নজিরও রয়েছে।

দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়লেও উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আন্তর্জাতিক র‍্যাঙ্কিংয়ে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উল্লেখ করার মতো কোনো অবস্থান নেই। শিক্ষার মান ও উচ্চশিক্ষিত বেকার—এই দুই বিবেচনায় দেশে নতুন আর বিশ্ববিদ্যালয় প্রয়োজন আছে কি না, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে। নতুন বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয়সংখ্যক যোগ্য শিক্ষক আছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার মান কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে না পৌঁছানোর বড় কারণ হলো প্রয়োজনের তুলনায় বাজেট বরাদ্দ অত্যন্ত সীমিত। উচ্চশিক্ষা খাতে প্রয়োজনীয় বাজেট না বাড়িয়ে শুধু বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করলেই রাষ্ট্র ও সমাজ দক্ষ মানবসম্পদ পাবে না।

আমরা মনে করি, নতুন ২৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে সরকারকে একটি সিদ্ধান্তে আসতে হবে। ক্যাম্পাস, ল্যাবরেটরিসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ, শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পাঠদানের উপযোগী করে তুলতে হবে। প্রয়োজনে কয়েক বছর অপেক্ষা করে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার পরই শিক্ষা কার্যক্রম চালু করতে হবে। প্রস্তুতি ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় চলতে পারে না।

Read full story at source