পরাশক্তির খেলায় পাকিস্তানের বড় বাজি কি কাজে লাগবে
· Prothom Alo

ছোট ও মাঝারি শক্তির দেশগুলো খুব কমই নিজেদের ভৌগোলিক অবস্থান বেছে নেওয়ার সুযোগ পায়; তাদের হাতে কেবল সুযোগ থাকে সেই অবস্থানকে কীভাবে কাজে লাগানো যায় তা ঠিক করার। পাকিস্তান অবস্থান করছে দক্ষিণ এশিয়া, উপসাগরীয় অঞ্চল এবং চীনের সংযোগস্থলে।
Visit playerbros.org for more information.
দেশটি উৎপাদনে বেইজিংকে টেক্কা দিতে পারবে না, অর্থ খরচে রিয়াদকে টপকাতে পারবে না, আর ওয়াশিংটনের বৈশ্বিক প্রভাবের সমকক্ষ হওয়াও তার পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু পাকিস্তান নিজেকে এমন এক অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে, যাকে কোনো শক্তিই এড়িয়ে যেতে পারবে না।
ইসলামাবাদে এখন ঠিক এই হিসাব-নিকাশই উন্মোচিত হচ্ছে—যা কোনো কূটনৈতিক মিষ্টি কথায় নয়, বরং কঠোর বাস্তববাদের চশমা দিয়েই দেখা উচিত।
সৌদি–তুরস্ক–পাকিস্তান কেন এক হলোবিষয়টি শুরু করা যাক খোদ মূল ধারণাটি দিয়ে। জবিগনিউ ব্রজেজিনস্কি তাঁর বিখ্যাত বই ‘দ্য গ্র্যান্ড চেসবোর্ড’-এ এই পরিস্থিতির একটি নাম দিয়েছিলেন: ‘জিওপলিটিক্যাল পিভট’ বা ভূরাজনৈতিক অক্ষশক্তি।
তিনি অক্ষশক্তির সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছেন—এগুলো হলো এমন কিছু রাষ্ট্র ‘যাদের গুরুত্ব তাদের নিজস্ব ক্ষমতা বা আকাঙ্ক্ষা থেকে আসে না, বরং আসে তাদের সংবেদনশীল ভৌগোলিক অবস্থান এবং ভূরাজনৈতিক পরাশক্তিগুলোর আচরণের ওপর তাদের সম্ভাব্য নাজুক পরিস্থিতির প্রভাব থেকে।’
পাকিস্তান এই বর্ণনার সঙ্গে নিখুঁতভাবে মিলে যায়। দেশটির সীমানাজুড়ে রয়েছে ইরান, চীন ও ভারত। উপসাগরীয় মূলধনকে মধ্য এশিয়ার প্রাকৃতিক সম্পদের সঙ্গে সংযুক্তকারী রুটগুলোর ওপর এর অবস্থান। পাকিস্তানের প্রাসঙ্গিকতা তৈরি হয় সে কোথায় দাঁড়িয়ে আছে তা থেকে, একা সে কী তৈরি করতে পারে তা থেকে নয়।
বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্কের ফলে পাকিস্তান এমন এক অর্থনৈতিক ভারসাম্য ও সামরিক শক্তি পাচ্ছে, যা কোনো উপসাগরীয় রাষ্ট্রই দিতে পারবে না। পাশাপাশি, ইরান ও ওয়াশিংটন—উভয় পক্ষের সঙ্গেই পাকিস্তানের যে অপ্রকাশ্য যোগাযোগের পথ রয়েছে (যেখানে দুই চিরবৈরী দেশের একে অপরের প্রতি আস্থার চরম অভাব), তা এমন এক তৃতীয় স্তম্ভ হিসেবে কাজ করছে, যা রিয়াদ বা বেইজিং কোনো পক্ষই পুনরুত্পাদন করতে পারবে না।
সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে নতুন ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ পাকিস্তানের সেই প্রাসঙ্গিকতাকে এক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। এটি পাকিস্তানের নিরাপত্তা নীতিকে সরাসরি উপসাগরীয় আঞ্চলিক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত করেছে।
এই চুক্তি রিয়াদকে দিচ্ছে পারমাণবিক ক্ষমতাধর এক শক্তিশালী প্রতিরক্ষা অংশীদার। অন্যদিকে ইসলামাবাদ পাচ্ছে সৌদি মূলধন এবং ইউরোপের দিকে শিল্প প্রসারের সুযোগ।
এদিকে বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্কের ফলে পাকিস্তান এমন এক অর্থনৈতিক ভারসাম্য ও সামরিক শক্তি পাচ্ছে, যা কোনো উপসাগরীয় রাষ্ট্রই দিতে পারবে না।
পাশাপাশি, ইরান ও ওয়াশিংটন—উভয় পক্ষের সঙ্গেই পাকিস্তানের যে অপ্রকাশ্য যোগাযোগের পথ রয়েছে (যেখানে দুই চিরবৈরী দেশের একে অপরের প্রতি আস্থার চরম অভাব), তা এমন এক তৃতীয় স্তম্ভ হিসেবে কাজ করছে, যা রিয়াদ বা বেইজিং কোনো পক্ষই পুনরুত্পাদন করতে পারবে না।
পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরে বিক্ষোভ বন্দুকের নলে কি থামানো যাবেএই বিন্যাসে বেইজিংয়ের স্বার্থ নিছক বন্ধুত্বের চেয়ে অনেক বেশি গভীর। চীন তাদের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে ছায়া জাহাজের মাধ্যমে প্রণালি টপকে ইরানের প্রায় ৯০ শতাংশ তেল অত্যন্ত কম দামে কিনে থাকে। তবে তেহরানের জন্য চীন যুদ্ধে নেমে পড়বে না।
শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক বিজ্ঞানের অধ্যাপক জন মিয়ারশেইমারের তত্ত্ব ব্যাখ্যা করে কেন চীন এমন করবে: পরাশক্তিগুলো তখনই অন্যকে দিয়ে কাজ করায়, যখন প্রত্যক্ষ প্রতিরক্ষার খরচ অর্জিত লাভের চেয়ে বেশি হয়ে যায়।
কিন্তু তা সত্ত্বেও ইরানের পতন ও মার্কিন প্রভাববলয়ে চলে যাওয়া বেইজিং সহ্য করতে পারবে না। কারণ, উপসাগরীয় অঞ্চলে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের ভবিষ্যৎ, অঞ্চলের জ্বালানি সম্পদ এবং এর পুঁজির বাজার ইরান ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে বা তার চারপাশ দিয়েই আবর্তিত হয়। আর পাকিস্তান বেইজিংয়ের সেই হিসাবকে আরও ধারালো করে তোলে।
ভারত অবস্থান করছে চীনকে ঠেকানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র পরিচালিত জোট ‘কোয়াড’-এর ভেতরে। ওয়াশিংটন ও ইরানের মধ্যে দূরত্বের প্রতিটি মাইল মানেই হলো এমন এক উপসাগরীয় অঞ্চল তৈরি হওয়া, যা দুই পাশ থেকেই বেইজিংয়ের জন্য অবরুদ্ধ—যার পূর্ব দিকে রয়েছে ভারতঘেঁষা অক্ষ আর পশ্চিমে মার্কিনঘেঁষা অক্ষ।
পাকিস্তানের পতাকা হাতে উদযাপনের দৃশ্যফলে চীনের কাছে পাকিস্তানের কৌশলগত মূল্য কেবল গোয়াদর বা সিপেকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। চীনকে ঠেকাতে বা ঘেরাও করতে প্রতিপক্ষ কীভাবে এগোচ্ছে তা বুঝতে এবং ইরান যাতে কোনোভাবেই সেই মার্কিন বলয়ে যোগ না দেয় তা নিশ্চিত করতে বেইজিংয়ের কাছে পাকিস্তানের গুরুত্ব অপরিসীম।
এটি প্রথাগত অর্থে কোনো জোট গঠনের প্রক্রিয়া নয়। জন মিয়ারশেইমার এটাকে দেখতেন পরনির্ভরশীলতার বিরুদ্ধে একধরনের প্রতিরক্ষা কৌশল হিসেবে।
‘দ্য ট্র্যাজেডি অব গ্রেট পাওয়ার পলিটিকস’ গ্রন্থে মিয়ারশেইমার লিখেছেন, ‘বিশ্বজুড়ে প্রতিটি প্রধান রাষ্ট্রই নিজেদের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে।’ রাষ্ট্রগুলো বন্ধুত্ব বাড়ায় না; তারা নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করে।
পাকিস্তানের নেতৃত্ব এই সত্যটি সহজাতভাবেই বোঝে। দেশটি কোনো নির্দিষ্ট ব্লকে জয়ী হতে চাইছে না। এটি কোনো ব্লকের নিজস্ব না হয়ে, একই সঙ্গে প্রতিটি ব্লকের কাছে নিজেকে দরকারী বা প্রয়োজনীয় হিসেবে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে।
পাকিস্তান: ‘সিকিউরিটি স্টেট’ যেভাবে পুরো দেশকেই শত্রুতে পরিণত করছেহেনরি কিসিঞ্জার তাঁর ‘ওয়ার্ল্ড অর্ডার’ গ্রন্থে এই ধরনের ভারসাম্য বজায় রাখা কেন কঠিন, তার সবচেয়ে স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি পর্যবেক্ষণ করেছেন যে, ‘ক্ষমতার ভারসাম্য কখনোই স্থির থাকে না; এর উপাদানগুলো ক্রমাগত পরিবর্তিত হয়।’ একটি ‘হিঞ্জ স্টেট’-এর প্রভাব কোনো স্থায়ী সম্পদ নয়। অন্য সম্পর্কের বিনিময়ে যখন কোনো একটি সম্পর্ক অতিরিক্ত গভীর হয়ে যায়, তখনই এই প্রভাব কমতে শুরু করে।
পাকিস্তান যদি রিয়াদের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ে, তবে তেহরানের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা হারাবে। আবার বেইজিংয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হলে ওয়াশিংটনের কাছে তার ব্যবহারযোগ্যতা শেষ হয়ে যাবে। দরজার কবজা বা ‘হিঞ্জ’-এর মূল্য ঠিক সেখানেই থাকে—যতক্ষণ না তা এক পাশে স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
রাশিয়ার সোভিয়েত-উত্তর পররাষ্ট্রনীতির স্থপতি ইয়েভগেনি প্রিমাকভ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা সম্পর্কে একটি প্রাসঙ্গিক পয়েন্ট তুলে ধরেছিলেন। তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন যে, ‘আধুনিক বিশ্ব আসলেই বহুমেরুকেন্দ্রিক জটিল এবং গতিশীল।’ তাই একক কোনো কেন্দ্রকে ঘিরে বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার যেকোনো চেষ্টা ‘ব্যর্থ হতে বাধ্য’।
প্রিমাকভ পরাশক্তিদের নিয়ে লিখেছিলেন, ছোট বা মাঝারি শক্তিদের নিয়ে নয়। কিন্তু এই যুক্তি ছোট শক্তিগুলোর ক্ষেত্রেও একইভাবে খাটে। যে বিশ্ব আর একটি মাত্র কেন্দ্রের অধীনে নিয়ন্ত্রিত হয় না, সেখানে পাকিস্তানের মতো রাষ্ট্রের গুরুত্ব কমার বদলে বরং আরও বাড়ে। বহুমেরু বিশ্বই হলো সেই মুক্ত বাতাস, যেখানে পাকিস্তানের মতো অক্ষশক্তিগুলো শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়।
ইসলামাবাদের জন্য এই বাজিটি মোটেও কোনো কাল্পনিক বিষয় নয়। এর সফলতা মানে হলো—রিয়াদ, বেইজিং, তেহরান এবং ওয়াশিংটন যেকোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে পাকিস্তানের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে তা আগেভাগে হিসাব করবে এবং সেই অনুযায়ী নিজেদের সামলে নেবে।
তবে এই কৌশলের কোনোটিই ঝুঁকিমুক্ত নয়। এই কৌশলের নিচে তিনটি বড় ঝুঁকি লুকিয়ে রয়েছে।
প্রথমেই রয়েছে, ‘ব্লক ক্যাপচার’। বেইজিং বা রিয়াদ যদি ধরে নেয় যে পাকিস্তান পুরোপুরি তাদের পকেটে চলে এসেছে, তবে ওয়াশিংটন ও তেহরানের কাছে পাকিস্তানের কূটনৈতিক মূল্য মুহূর্তেই ধসে পড়বে।
দ্বিতীয়ত রয়েছে ‘ওভারএক্সটেনশন’। নিজেদের সামরিক বা শিল্প সক্ষমতা না থাকা সত্ত্বেও একসঙ্গে চারটি ভিন্ন ময়দানে বড় বড় প্রতিশ্রুতি দিয়ে বসলে এমন এক ধাক্কা আসতে পারে, যা সামলানোর ক্ষমতা ইসলামাবাদের একযোগে সব জায়গায় থাকবে না।
তৃতীয়ত আস্থার ঘাটতি। এটি সবচেয়ে ক্ষতিকারক ঝুঁকি। এই শক্তি কেবল ততক্ষণই টিকে থাকে, যতক্ষণ প্রতিটি পক্ষ বিশ্বাস করে যে দেশটি তার কথা রাখবে।
কোনো এক অংশীদার যদি মনে করে যে পাকিস্তান তাদের সঙ্গে খেলা করছে বা প্রতারণা করছে, তবে পাকিস্তানের দর–কষাকষির ক্ষমতা কেবল দুর্বলই হবে না, বরং পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
ইসলামাবাদের জন্য এই বাজিটি মোটেও কোনো কাল্পনিক বিষয় নয়। এর সফলতা মানে হলো—রিয়াদ, বেইজিং, তেহরান এবং ওয়াশিংটন যেকোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে পাকিস্তানের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে তা আগেভাগে হিসাব করবে এবং সেই অনুযায়ী নিজেদের সামলে নেবে। আর ব্যর্থতা মানে হলো ব্রজেজিনস্কির ভাষায়, পাকিস্তান এক পরাশক্তির ‘অক্ষ’ হওয়ার বদলে অন্য কোনো শক্তির ‘অধীন’-এ পরিণত হবে।
জাসিম আল-আজাবি সাংবাদিক।
মিডল ইস্ট মনিটর থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।