তরুণেরাও কেন হৃদ্রোগের ঝুঁকিতে, ভালো থাকার উপায় কী
· Prothom Alo
মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন (৩২) একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা। সারা দিন অফিসের ডেস্কে বসেই কাজ করতে হয় তাঁকে। দীর্ঘ সময় কম্পিউটারের সামনে থাকতে হয়। এর সঙ্গে আছে কাজের চাপ, পারিবারিক ও ব্যক্তিগত নানা দুশ্চিন্তা।
Visit moryak.biz for more information.
কয়েক মাস ধরে নানা শারীরিক সমস্যাও হচ্ছিল তাঁর। সম্প্রতি বুকে ব্যথা অনুভব করলে পরিবারের পরামর্শে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যান। চিকিৎসকের পরামর্শে ইসিজি, ইকোসহ বিভিন্ন পরীক্ষা করান তিনি। পরীক্ষায় উচ্চ রক্তচাপ ও কোলেস্টেরলের সমস্যা ধরা পড়ে। অতিরিক্ত ওজনের সমস্যাও রয়েছে তাঁর। হৃদ্যন্ত্রের কিছু জটিলতার আশঙ্কা করে আরও পরীক্ষা দিয়েছেন চিকিৎসক।
চট্টগ্রাম মেডিকেলে মাসে ওপেন হার্ট সার্জারি হয় ৬/৭টি, সংকট অনেকসম্প্রতি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মূল ফটকের সামনে কথা হয় ইকবাল হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, বয়স কম হওয়ায় শুরুতে হৃদ্রোগের কথা ভাবেননি। বুকে ব্যথা হওয়ার পর বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখেছেন। এখন প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার অপেক্ষায় আছেন।
ইকবাল হোসেনের মতো তরুণদের অনেকেই মনে করেন, হৃদ্রোগ বয়স্কদের রোগ। কিন্তু চিকিৎসকেরা বলছেন, এই ধারণা এখন আর ঠিক নয়। কম বয়সীদের মধ্যেও উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, রক্তে চর্বির অস্বাভাবিকতা ও হৃদ্রোগের ঝুঁকি দেখা যাচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক জরিপ অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বিভাগে প্রতি এক হাজার জনের মধ্যে ৩৪ থেকে ৩৬ জন হৃদ্রোগের জটিলতায় ভুগছেন। অর্থাৎ এ বিভাগের প্রতি ৩০ জনের মধ্যে একজন হৃদ্রোগে আক্রান্ত। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, চট্টগ্রাম জেলার জনসংখ্যা ৯১ লাখ ৬৯ হাজার ৪৬৫। এই হিসাব অনুযায়ী, চট্টগ্রামের প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার মানুষের মধ্যে হৃদ্রোগের প্রাদুর্ভাব রয়েছে। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, যদিও এ হিসাব আনুমানিক। তবে সম্প্রতি হৃদ্রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েছে।
আজ ২৯ সেপ্টেম্বর বিশ্ব হার্ট দিবস। এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘প্রতিটি হৃৎস্পন্দনই জীবন’। অর্থাৎ যত্ন নিতে হবে প্রতিটি হৃৎস্পন্দনের।
তরুণেরা কেন ঝুঁকিতে?
চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণদের প্রায় ২০ শতাংশ উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। তাঁদের ৭০ শতাংশের বেশি জানেন না যে তাঁদের উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে। আবার ১৮ থেকে ৩৯ বছর বয়সীদের ১১ থেকে ১৫ শতাংশের রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি। তাঁদের প্রায় ৮০ শতাংশই বিষয়টি জানেন না। তরুণদের মধ্যে কোলেস্টেরলের সমস্যাও রয়েছে। কোলেস্টেরলের সমস্যা থেকে বাড়ছে হৃদ্রোগের ঝুঁকি।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হৃদ্রোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. খোরশেদ আলম বলেন, এই ঝুঁকির সঙ্গে বদলে যাওয়া জীবনযাপনের সম্পর্ক রয়েছে। দীর্ঘ সময় মুঠোফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার, ঘুমের ঘাটতি, মানসিক চাপ, প্রক্রিয়াজাত খাবার, ধূমপান, মাদক ও ইলেকট্রনিক সিগারেট তরুণদের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বলে জানান খোরশেদ আলম। মাঠে খেলাধুলা বা হাঁটার সুযোগ কমে যাওয়াও এর সঙ্গে যুক্ত।
শৈশব থেকেই এই ঝুঁকির ভিত্তি তৈরি হচ্ছে বলে মনে করেন রাঙামাটি মেডিকেল কলেজের হৃদ্রোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. হাবিবুল ইসলাম চৌধুরী। তাঁর মতে, মাঠে খেলার বদলে শিশুরা দীর্ঘ সময় মুঠোফোন ব্যবহার করছে। ঘরে তৈরি খাবারের পরিবর্তে অস্বাস্থ্যকর খাবারের প্রবণতাও বাড়ছে। ফলে শারীরিক পরিশ্রম কমছে এবং দীর্ঘ সময় বসে থাকার অভ্যাস তৈরি হচ্ছে।
এই পরিবর্তন তরুণ বয়সে আরও স্পষ্ট হয়। বিশ্ববিদ্যালয়, চাকরি কিংবা ব্যবসায় দিনের বড় সময় বসে থাকা, বাইরে খাওয়া, অনিয়মিত ঘুম এবং কাজের চাপ অনেকের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে গেছে। এর সঙ্গে ধূমপান ও মাদকের অভ্যাস যুক্ত হলে ঝুঁকি আরও বাড়ে।
সহযোগী অধ্যাপক মো. সালেহ উদ্দিন সিদ্দিকী বলেন, ধূমপানের নিকোটিন রক্তচাপ ও হৃৎস্পন্দন বাড়ায় এবং রক্তনালি সংকুচিত করে। ধূমপান ও বিভিন্ন মাদক রক্তনালির ক্ষতি করে।
লক্ষণ বুঝে দ্রুত ব্যবস্থা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তরুণদের ক্ষেত্রে আরেকটি সমস্যা হলো লক্ষণকে গুরুত্ব না দেওয়া। বয়স কম হওয়ায় বুকের ব্যথা বা শ্বাসকষ্টকে অনেকে গ্যাস, ক্লান্তি কিংবা অন্য কোনো সাধারণ সমস্যা মনে করেন। এতে চিকিৎসা নিতে দেরি হয়। চিকিৎসা নিতে দেরি হলে হৃদ্যন্ত্রের ক্ষতি বাড়তে পারে। সাধারণভাবে প্রথম ১২ ঘণ্টার মধ্যে রোগীকে চিকিৎসার আওতায় আনা জরুরি।
চমেক হাসপাতালের হৃদ্রোগ বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ নূর উদ্দিন তারেক বলেন, হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে সব সময় তীব্র বুক ব্যথা না–ও হতে পারে। বুকের মাঝখানে চাপ বা ব্যথার সঙ্গে ঘাম, বমি বা বমি ভাব থাকতে পারে। আবার শুধু হাতে ঝিমঝিম, পিঠে অস্বস্তি, মাথা হালকা লাগা, ঘাম বা বমি ভাবও হতে পারে। বিশেষ করে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
চিকিৎসকেরা বলছেন, বুকে ব্যথা বা অস্বস্তি হলে সেটিকে শুধু গ্যাসের সমস্যা ধরে বসে থাকা ঠিক নয়। একইভাবে হঠাৎ শ্বাসকষ্ট, অস্বাভাবিক ঘাম, মাথা হালকা লাগা, বমি ভাব বা অস্বাভাবিক হৃৎস্পন্দন হলেও বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। শুধু মোট কোলেস্টেরল স্বাভাবিক থাকলেই ঝুঁকি নেই, এমন নয়। ভালো কোলেস্টেরল কম ও ট্রাইগ্লিসারাইড বেশি থাকলেও ঝুঁকি বাড়তে পারে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হৃদ্রোগ বিভাগের সাবেক প্রধান অধ্যাপক এ কে এম মনজুর মোরশেদ বলেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তুলনামূলক কম বয়সে হৃদ্রোগ ও হার্ট অ্যাটাকের প্রবণতা বেশি। অতিরিক্ত ওজন, বিশেষ করে পেটের মেদ, অল্প বয়সে ডায়াবেটিস, ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমে যাওয়া এবং রক্তে চর্বির অস্বাভাবিকতা এর গুরুত্বপূর্ণ কারণ। তরুণদের নিয়মিত পরীক্ষা করাতে হবে।
ঝুঁকি কমাতে যেভাবে যত্ন নেবেন
নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, স্বাস্থ্যকর খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম এবং ধূমপান ও মাদক থেকে দূরে থাকা—এই কয়েকটি বিষয় তরুণদের বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। অফিসে দীর্ঘ সময় বসে কাজ করা তরুণেরা কাজের ফাঁকে উঠে কিছুক্ষণ হাঁটতে পারেন। কাছাকাছি দূরত্বে সম্ভব হলে হেঁটে যাওয়া যায়। সপ্তাহে কয়েক দিন খেলাধুলা বা শরীরচর্চার জন্য আলাদা সময় রাখা যেতে পারে।
নিয়মিত হাঁটার অভ্যাস তৈরি করার পরামর্শ দিয়েছেন এ কে এম মনজুর মোরশেদ। তাঁর মতে, যাঁরা একেবারেই হাঁটেন না, তাঁরা অল্প সময় দিয়ে শুরু করতে পারেন। পরে ধীরে ধীরে সময় ও গতি বাড়ানো যায়। সপ্তাহে মোট ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক পরিশ্রম ভালো। তবে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, অতিরিক্ত ওজন বা রক্তে চর্বি বেশি থাকলে ব্যায়াম শুরুর আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
খাবারের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন জরুরি। হৃদ্রোগবিশেষজ্ঞ প্রবীর কুমার দাশ বলেন, বাইরে ও প্রক্রিয়াজাত খাবারে অনেক সময় অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও চর্বি থাকে। তাই এসব খাবার কমিয়ে পরিমিত ও ভারসাম্যপূর্ণ খাবারে অভ্যস্ত হওয়া দরকার। তিনি দিনে ৫ গ্রামের কম লবণ খাওয়ার পরামর্শের কথাও উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, রাত জেগে মুঠোফোন ব্যবহার বা কাজ করার অভ্যাসও কমাতে হবে। পর্যাপ্ত ঘুমের পাশাপাশি মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করতে হবে। কাজের চাপ, পারিবারিক সমস্যা বা ব্যক্তিগত দুশ্চিন্তা দীর্ঘদিন থাকলে তা নিজের মধ্যে জমিয়ে না রেখে পরিবার, বন্ধু বা প্রয়োজন হলে বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলা যেতে পারে।