আবারও ইরানের বিরুদ্ধে হামলার ছক, কী চায় ইসরায়েল

· Prothom Alo

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ শুরু করেছিল, তা বর্তমানে একধরনের সাময়িক বিরতিতে রয়েছে, তবে শেষ হয়ে যায়নি। বড় ধরনের সামরিক অভিযান থমকে আছে, কূটনৈতিক আলোচনা স্তব্ধ হয়ে আছে এবং উভয় পক্ষই পরবর্তী ধাপের সংঘর্ষের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।

কেন এই যুদ্ধ আবারও শুরু হতে যাচ্ছে, তা বুঝতে হলে যুদ্ধ শুরু করা দুই সরকারের আসল উদ্দেশ্য জানা প্রয়োজন। তাদের কেউই শান্তি চায় না। ইসরায়েলের নেতৃত্ব চায় মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে, আর যুক্তরাষ্ট্র চায় বিশ্বে তাদের আধিপত্য বজায় রাখতে। কেবল এই লক্ষ্যগুলোর কথা উল্লেখ করাটাই প্রমাণ করে যে উভয় সরকারই মোহ বা বিভ্রান্তির জগতে বসবাস করছে।

Visit casino-promo.biz for more information.

ইসরায়েলের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এই ধারণায় আচ্ছন্ন যে ইসরায়েলের টিকে থাকা নির্ভর করছে আরব বিশ্বের ওপর তাদের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব স্থাপন ও ফিলিস্তিনি জনগণকে স্থায়ীভাবে দমন করা বা নির্মূল করার ওপর।

এই বিশ্বাসটি একধরনের সম্মিলিত উন্মাদনা ছাড়া কিছুই নয়, অথচ এই নীতিই বর্তমানে ইসরায়েলের রাষ্ট্র পরিচালনাকে নিয়ন্ত্রণ করছে। ইসরায়েলের নেতারা এটা মেনে নিতে পারছেন না যে শান্তি সত্যিই নাগালের মধ্যে।

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা কেন বারবার ব্যর্থ হচ্ছে সামনে বড় সুযোগ, কাজে লাগাবে কি ইরান

২০০২ সালের ‘আরব পিস ইনিশিয়েটিভ’-এ আরব দেশগুলো ১৯৬৭ সালের সীমানার ভিত্তিতে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের বিনিময়ে ইসরায়েলকে পূর্ণ স্বাভাবিক সম্পর্কের প্রস্তাব দিয়েছিল এবং সেই প্রস্তাব এখনো বহাল রয়েছে।

কিন্তু গাজায় গণহত্যা চালিয়ে কিংবা ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতি ঘৃণা ছড়িয়ে ও তাদের নিজ ভূমি থেকে উৎখাত করে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। অথচ প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই পথটিকেই বেছে নিয়েছেন এবং তিনি এখন তাঁর ‘জাতীয় ধর্মীয়’ মিত্রদের নিয়ে প্রকাশ্যে এই প্রচার চালাচ্ছেন—যার মধ্যে ইতামার বেন-গভির এবং বেজালেল স্মোটরিচের মতো চরমপন্থীরা রয়েছেন, যাঁরা ঘৃণা ছড়ানো ও মানুষ হত্যার উদ্দেশ্যে ধর্মের বিকৃতি ঘটাচ্ছেন।

যুক্তরাষ্ট্রকে গ্রাস করেছে তার ক্ষমতার ক্রমাবনতি। গত ৭০ বছরের বেশি সময় ধরে ইরান আমেরিকার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়ে আছে। ১৯৫৩ সালে সিআইএ ও ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা ইরানের তেল সম্পদ জাতীয়করণের অপরাধে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেককে উৎখাত করেছিল।

এরপর যুক্তরাষ্ট্র সেখানে শাহর শাসন প্রতিষ্ঠা করে এবং ১৯৭৯ সালে ইরানি জনগণ তাঁকে উৎখাত না করা পর্যন্ত তাঁর পেটোয়া পুলিশি রাষ্ট্রকে সমর্থন জানিয়েছিল।

কেন এই যুদ্ধ আবারও শুরু হতে যাচ্ছে, তা বুঝতে হলে যুদ্ধ শুরু করা দুই সরকারের আসল উদ্দেশ্য জানা প্রয়োজন। তাদের কেউই শান্তি চায় না। ইসরায়েলের নেতৃত্ব চায় মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে, আর যুক্তরাষ্ট্র চায় বিশ্বে তাদের আধিপত্য বজায় রাখতে। কেবল এই লক্ষ্যগুলোর কথা উল্লেখ করাটাই প্রমাণ করে যে উভয় সরকারই মোহ বা বিভ্রান্তির জগতে বসবাস করছে।

মার্কিন আধিপত্যের হাত থেকে ইরান বেরিয়ে যাওয়ার অপরাধকে ওয়াশিংটন কখনো ক্ষমা করেনি। ১৯৮০-এর দশকে ইরানের বিরুদ্ধে সাদ্দাম হোসেনের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধকে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন দেয় এবং পরবর্তী সময়ে চার দশক ধরে অর্থনৈতিক যুদ্ধ, গোপন অভিযান, সাইবার হামলা ও রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড চালায়।

ট্রাম্প ২০১৮ সালে ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি বাতিল করেন, ২০২৫ সালের জুনে ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোতে বোমাবর্ষণ করেন এবং চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইসরায়েলের সঙ্গে উন্মুক্ত যুদ্ধে যোগ দিয়ে প্রথম আঘাতেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা করেন।

ইরানের প্রতি ওয়াশিংটনের এই অতি-মনোযোগ আসলে মার্কিন আধিপত্য রক্ষার স্বার্থেই। ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত ‘দ্য গ্র্যান্ড চেসবোর্ড’ বইতে জেবিগনিউ ব্রজেজিনস্কি ইরানকে পাঁচটি ‘ভূরাজনৈতিক স্তম্ভের’ একটি হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন—যে রাষ্ট্রগুলোর গুরুত্ব তাদের নিজস্ব ক্ষমতার চেয়ে তাদের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বেশি। ইরান পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ করে।

ব্রজেজিনস্কি লিখেছিলেন, চীন, রাশিয়া ও ইরানের একটি ‘আধিপত্যবিরোধী’ জোট কেবল তখনই তৈরি হতে পারে ‘যদি যুক্তরাষ্ট্র একই সঙ্গে চীন এবং ইরানকে প্রতিপক্ষ বানানোর মতো অদূরদর্শী ভুল করে।’ দুর্ভাগ্যবশত ওয়াশিংটন ঠিক সেই অদূরদর্শী ও দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজটিই করেছে।

ইরান যুদ্ধ যেভাবে পাকিস্তান, তুরস্ক ও মিসরকে আরও সংকটে ফেলে দিয়েছে ইরান যেভাবে যুদ্ধরীতির ধরন বদলে দিল

যুদ্ধ যে আবার শুরু হতে যাচ্ছে তার লক্ষণগুলো মোটেও গোপন নয়। এ সপ্তাহে যুদ্ধবিষয়ক সচিব পিট হেগসেথ ইসরায়েল সফর করে আবার যৌথ হামলার বিষয়ে আলোচনা করেছেন এবং ইসরায়েলি সূত্রে জানা গেছে, এই হামলার মূল লক্ষ্য ইরানের পেট্রোকেমিক্যাল কেন্দ্র ও পারমাণবিক স্থাপনাগুলো।

হোয়াইট হাউস প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে নভেম্বরের ৩ তারিখের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্র ইরান আক্রমণ করবে না—যার অর্থ আসলে যুদ্ধের একটি সময়সূচি ঘোষণা করে দেওয়া। ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ-অবরোধ ইতিমধ্যে ১০০ দিন অতিক্রম করেছে।

গত সেপ্টেম্বরে ইরানের দেওয়া সাত দিনের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব ট্রাম্প প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, যদিও তেহরান জানিয়েছে যে সেই প্রস্তাব এখনো টেবিলে রয়েছে।

২৭ অক্টোবরের ইসরায়েলি নির্বাচন আগুনে আরও ঘি ঢেলে দিয়েছে। ১৮ অক্টোবর ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে সমর্থন দিয়ে বলেছিলেন যে নেতানিয়াহু ক্ষমতায় থাকলেই কেবল যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে ‘কাজ শেষ করতে পারবে’।

ইসলামি বিপ্লবের ৪৭তম বার্ষিকীতে তেহরান অস্ত্র প্রদর্শন করে

২১ অক্টোবর ডিমোনায় (যেখানে ইসরায়েল গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করেছিল) এক সমাবেশে নেতানিয়াহু ঘোষণা করেন যে ইরানি হুমকি দূর করার একমাত্র উপায় হলো সেদেশের সরকার উৎখাত করা এবং তিনি নাকি ইতিমধ্যেই সেনাবাহিনী, মোসাদ ও নিরাপত্তা সংস্থাকে সেই নির্দেশ দিয়ে দিয়েছেন।

ইরান স্বাভাবিকভাবেই এর থেকে নিজের সিদ্ধান্ত টেনে নিয়েছে। তাদের কমান্ডাররা এক নতুন প্রতিরোধমূলক নীতি ঘোষণা করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে আগাম হামলা ও ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত প্রতিবেশী দেশগুলোর সামরিক ঘাঁটিতে আক্রমণ করার হুমকি। তাঁরা সতর্ক করে দিয়েছেন যে নতুন করে হামলা শুরু হলে তা বৈশ্বিক জ্বালানিসংকট তৈরি করবে। চলতি মাসে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলার ঘটনা নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে।

এটিই সেই নির্মম বাস্তবতা, যার মুখোমুখি এখন আরব বিশ্ব—বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশগুলো। সমগ্র উপসাগরে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো এই যুদ্ধে নিরাপত্তা আনতে পারেনি; বরং তারা স্বাগতিক দেশগুলোকে আক্রমণকারীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে।

ইরান নিয়ে যে চিঠি পশ্চিমা বুদ্ধিজীবীদের মুখোশ আবারও খুলে দিলযুদ্ধের ধাক্কা সামলে কীভাবে টিকল ইরান 

‘ভাগ করো এবং শাসন করো’—মার্কিন-ইসরায়েলি এই কৌশলে ইরানকে অঞ্চলের স্থায়ী শত্রু বানিয়ে আরব দেশগুলোকে মার্কিন ক্ষমতার ছায়াতলে আশ্রয় নিতে ও ইসরায়েলি আধিপত্য মেনে নিতে বলা হয়েছিল।

এর পরিণতি হিসেবে অঞ্চলে যুদ্ধ নেমে এসেছে, উপসাগরীয় দেশগুলো অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়েছে এবং ফিলিস্তিন ও লেবাননে গণহারে মানুষ হত্যা করা হয়েছে।

এই উন্মাদনা বন্ধ করার একমাত্র উপায় হলো আরব বিশ্বের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে এক বাক্যে জানিয়ে দেওয়া যে ‘অনেক হয়েছে, আর নয়’। আরব দেশগুলোর স্পষ্ট ঘোষণা করা উচিত যে তারা কখনো ইসরায়েলি আধিপত্য মেনে নেবে না, একটি সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠিত হতেই হবে এবং এই অঞ্চলের নিরাপত্তা ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভর করে নয়, বরং আঞ্চলিক সহমর্মিতা ও সহযোগিতার মাধ্যমেই আসবে।

এর সমাধান হতে পারে দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক নীতি (যেমনটা আরব পিস ইনিশিয়েটিভে রয়েছে) অথবা একটি দ্বিজাতীয় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, কিংবা একটি কনফেডারেশন।

ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মোসাল্লায় ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে চলছে প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতার রাষ্ট্রীয় বিদায় অনুষ্ঠান

মূলকথা হলো ইসরায়েলি ইহুদি এবং ফিলিস্তিনি আরব—উভয় পক্ষের প্রায় ৮০ লাখ মানুষকে শান্তি, নিরাপত্তা ও আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার নিয়ে বসবাস করতে দিতে হবে। যা কোনোভাবেই সম্ভব নয়, তা হলো ইসরায়েলের এই নির্মম বর্ণবাদী (অপার্থাইড) শাসনকে চিরস্থায়ী করা।

এর সূচনা ইতিমধ্যেই দেখা যাচ্ছে। কাতার ‘উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ’ (জিসিসি) ভুক্ত দেশসমূহ, তুরস্ক এবং পাকিস্তানের মধ্যে একটি আঞ্চলিক আলোচনার আহ্বান জানিয়েছে। কাতার, পাকিস্তান ও ওমান যুদ্ধের সময়জুড়েই তেহরানের সঙ্গে মধ্যস্থতার পথ খোলা রেখেছে।

এই প্রচেষ্টাগুলোকে একটি স্থায়ী আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোতে রূপ দেওয়া উচিত, যার মধ্যে ইরান, উপসাগরীয় দেশগুলো, মিসর, তুরস্ক, ইরাক ও পাকিস্তান অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এই কাঠামোটি পারস্পরিক অনাগ্রাসন, অবাধ নৌ চলাচল এবং একটি পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত অঞ্চলের ওপর ভিত্তি করে গঠিত হবে—যেখানে শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলকেও অন্তর্ভুক্ত হতে হবে।

আরব দেশগুলোর হাতে যতটা দর–কষাকষির ক্ষমতা রয়েছে, তা তারা নিজেরাও হয়তো অনুধাবন করতে পারছে না।

যদি সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার এবং তাদের প্রতিবেশীরা ঘোষণা করে যে তাদের ভূখণ্ড বা আকাশসীমা ইরানের বিরুদ্ধে নতুন কোনো যুদ্ধের জন্য ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্র না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আলোচনা স্থগিত থাকবে—তবে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের হিসাব-নিকাশ দ্রুত বদলে যেতে বাধ্য।

আর আমেরিকার সাধারণ জনগণ, যারা ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ পছন্দ করে না এবং ফিলিস্তিনের পক্ষে রয়েছে, তারা একে স্বাগত জানাবে।

আমেরিকার নেতৃত্বে ‘ভাগ করো এবং শাসন করো’ নীতির যুগ—যেখানে ইরানকে আরব বিশ্বের স্থায়ী শত্রু বানিয়ে রাখা হয়েছিল—তার অবসান ঘটেছে, যদিও ওয়াশিংটন ও তেল আবিব তা স্বীকার করতে অস্বীকার করছে।

পরবর্তী ধাপের যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই আরব দেশগুলোর উচিত প্রকাশ্যে এই সত্য ঘোষণা করা এবং তা করার মাধ্যমেই তারা একটি নিজস্ব নিরাপদ ও শান্তিময় অঞ্চলের পথ প্রশস্ত করতে পারে।

  • জেফরি ডি স্যাক্স কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং সেন্টার ফর সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্টের পরিচালক। সিবিল ফারেস জাতিসংঘ টেকসই উন্নয়ন সমাধান নেটওয়ার্কের মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকাবিষয়ক উপদেষ্টা। আল-জাজিরা থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।

Read full story at source