মেট্রোরেলে কমলাপুর, দূর নয় আর বেশি দিন
· Prothom Alo

ঢাকার মিরপুরের কাজীপাড়ায় থাকেন মো. মহসিন হোসেন। প্রতি সপ্তাহে একবার গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া যান তিনি। কাজীপাড়া স্টেশন থেকে মেট্রোরেলে চড়ে মতিঝিল নামেন। সেখান থেকে ৫০ টাকা রিকশা ভাড়া দিয়ে কমলাপুর গিয়ে বাস বা ট্রেনে উঠেন। একইভাবে বাড়ি থেকে কমলাপুর নেমে একইভাবে বাসায় ফেরেন।
Visit esporist.com for more information.
মহসিন হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রোরেল চলাচল করলে তাঁর সময় ও টাকা দুটোই বাঁচবে। কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রোরেল চালুর অপেক্ষায় আছেন তিনি।
তাঁর মতো অনেকের অপেক্ষার অবসান ঘটতে যাচ্ছে। মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত পথে মেট্রোরেলের চলাচল আগামী জানুয়ারিতে শুরুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তবে এই যাত্রা হবে যাত্রীবিহীন। অর্থাৎ পরীক্ষামূলকভাবে চলাচল শুরু হবে। যাত্রী নিয়ে কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রোরেল যাবে তার তিন মাস পর এপ্রিলে। এমন পরিকল্পনা নিয়েই এগোচ্ছে মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ।
মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ সূত্র জানিয়েছে, মতিঝিল থেকে কমলাপুর অংশের উড়ালপথ নির্মাণকাজ শেষ হয়ে গেছে। কমলাপুরে মেট্রোরেলের জন্য স্টেশনও নির্মিত হয়েছে। এখন স্টেশনে টাইলস-গ্রানাইট, রং করাসহ অন্যান্য কাজ চলছে। তবে রেললাইন এবং বিদ্যুতের কাজ কেবল শুরু হয়েছে। এটিকে ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল (বিদ্যুৎ, সংকেত ব্যবস্থা, রেললাইন) কাজ বলা হয়।
মেট্রোরেল কমলাপুর পর্যন্ত সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ২০২২ সালে। ২০২৫ সালের জুনে এই অংশ চালুর সিদ্ধান্ত ছিল। সম্প্রসারিত অংশে উড়ালপথ ও কমলাপুরে স্টেশন নির্মাণকাজের জন্য ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হয় ২০২৩ সালে। মতিঝিল থেকে কমলাপুর অংশের ভৌত কাজ করছে থাইল্যান্ডভিত্তিক ইতাল-থাই ডেভেলপমেন্ট পাবলিক কোম্পানি। তাদের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে ৫১১ কোটি টাকার। তারা সহযোগী হিসেবে নিয়েছে বাংলাদেশের ম্যাকডোনাল্ড স্টিলকে।
মেট্রোরেল কমলাপুর পর্যন্ত সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ২০২২ সালে। ২০২৫ সালের জুনে এই অংশ চালুর সিদ্ধান্ত ছিল। সম্প্রসারিত অংশে উড়ালপথ ও কমলাপুরে স্টেশন নির্মাণকাজের জন্য ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হয় ২০২৩ সালে। মতিঝিল থেকে কমলাপুর অংশের ভৌত কাজ করছে থাইল্যান্ডভিত্তিক ইতাল-থাই ডেভেলপমেন্ট পাবলিক কোম্পানি। তাদের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে ৫১১ কোটি টাকার। তারা সহযোগী হিসেবে নিয়েছে বাংলাদেশের ম্যাকডোনাল্ড স্টিলকে।
অন্যদিকে ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল কাজের জন্য ঠিকাদার নিয়োগ দিতে দেরি হয়। কারণ, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ঠিকাদার এই কাজের জন্য ৬৫১ কোটি টাকা দর প্রস্তাব করেছিল। অন্তর্বর্তী সরকার এসে ব্যয় কমানোর জন্য ঠিকাদারকে চাপ দেয়। এরপর দর-কষাকষি করে ব্যয় ১৮৬ কোটি টাকা কমানো হয়েছে। গত বছর ভারতীয় প্রতিষ্ঠান লারসন অ্যান্ড ট্যুবরোকে ৪৬৫ কোটি টাকায় নিয়োগ দেওয়া হয় এই কাজের জন্য।
রাতের মেট্রোরেলের সময় নিয়ে নতুন ভাবনা, কতক্ষণ বাড়তে পারেআগামী জানুয়ারিতে পরীক্ষামূলক যাত্রা শুরু করে এপ্রিলে মতিঝিল থেকে কমলাপুর যাত্রী পরিবহণ করতে চায় মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ।ঢাকায় মেট্রোরেল নির্মাণ ও পরিচালনায় রয়েছে ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)। সংস্থাটির সর্বশেষ মাসিক প্রতিবেদন অনুসারে, গত জুন পর্যন্ত মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত অংশের কাজের অগ্রগতি ৭৮ দশমিক ৩৮ শতাংশ।
মোহাম্মদ আব্দুল ওহাব, প্রকল্প পরিচালকমতিঝিল থেকে কমলাপুর অংশের বাকি কাজ পুরোদমে চলছে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে জানুয়ারিতে পরীক্ষামূলক চলাচল শুরু হবে।প্রক্ষেপণ অনুসারে, উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত দৈনিক পাঁচ লাখ যাত্রী পরিবহন করার কথা। তবে বর্তমানে মেট্রোরেলে দিনে চার লাখের বেশি যাত্রী যাতায়াত করেন। কমলাপুর পর্যন্ত চালু হলে দৈনিক যাত্রীসংখ্যা ৬ লাখ ৭৭ হাজারে উন্নীত হওয়ার কথা।
মেট্রোরেলে কমলাপুর যেতে আরও অপেক্ষা, দেরি কেন মতিঝিল শাপলা চত্বরের ওপর দিয়ে কমলাপুরে গেছে মেট্রোরেলের লাইনযেসব কাজ বাকি
মেট্রোরেলের মতিঝিল-কমলাপুর পথের কাজ দুটি অংশে (প্যাকেজ) ভাগ করা হয়েছে। ভৌত অংশে রয়েছে উড়ালপথ ও কমলাপুরে স্টেশন নির্মাণ। ট্রেন চালাতে হলে আরও সাত ধরনের কাজ করতে হবে। সেগুলো হলো—রেললাইন, লিফট, এস্কেলেটর, মনিটর, ট্রেনের দরজার সঙ্গে মিলিয়ে বাইরের দরজা, সংকেতব্যবস্থা ও স্বয়ংক্রিয় ভাড়া আদায়ের যন্ত্রপাতি বসানো। এ ছাড়া রয়েছে ট্রেন চালানোর ও স্টেশন ভবনের জন্য সাবস্টেশনসহ বিদ্যুৎ-ব্যবস্থা স্থাপন করা। এসব কাজ একটি প্যাকেজের আওতায় আনা হয়েছে। অবশ্য এ অংশের জন্য নতুন রেল বা কোচের প্রয়োজন নেই। কেননা, তা (২৪ সেট) আগেই আমদানি করা হয়েছে।
উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত দৈনিক পাঁচ লাখ যাত্রী পরিবহন করার কথা। তবে বর্তমানে মেট্রোরেলে দিনে চার লাখের বেশি যাত্রী যাতায়াত করেন। কমলাপুর পর্যন্ত চালু হলে দৈনিক যাত্রীসংখ্যা ৬ লাখ ৭৭ হাজারে উন্নীত হওয়ার কথা।
ডিএমটিসিএল সূত্র জানিয়েছে, মতিঝিল থেকে কমলাপুর অংশের লাইন ও বিদ্যুতের খুঁটি এবং তার বসানোর কাজ শুরু হয়েছে ৪ জুলাই। আগস্টের মধ্যে এই কাজ শেষ করার পরিকল্পনা আছে। তবে সংকেতব্যবস্থা, ভাড়া আদায় ও স্টেশনে প্রবেশের স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা স্থাপন এবং প্ল্যাটফর্মের স্বয়ংক্রিয় দরজা বসানোর কাজ শেষ করতে সময় লাগবে। এসব কাজের সব যন্ত্র আসবে জাপানের নিপ্পন সিগন্যাল কোম্পানি থেকে। ইতিমধ্যে যন্ত্রপাতির ফরমাশ দেওয়া হয়েছে। তবে বিভিন্ন দেশে একই ধরনের যন্ত্রের চাহিদা থাকায় বাংলাদেশের যন্ত্রপাতি এখনো আসেনি।
কোনো কারণে জাপানি যন্ত্রপাতি আসতে দেরি হলে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে অন্যান্য স্টেশনে থাকা যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে পরীক্ষামূলক চলাচল নিশ্চিত করা হতে পারে। তবে জানুয়ারির আগেই যন্ত্রপাতি পেয়ে যাওয়ার আশা করছে ডিএমটিসিএল কর্তৃপক্ষ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, পরীক্ষামূলক চলাচল দুই মাস করলেই চলত। কিন্তু উত্তরা থেকে মতিঝিল অংশে যাত্রী নিয়ে মেট্রোরেল চলাচল করার কারণে দিনের বেলা পরীক্ষামূলক চলাচল সম্ভবপর নয়। উত্তরা থেকে পুরো কমলাপুর পর্যন্ত পরীক্ষা চালানো হবে রাত ১২টার পর। এ জন্য পরীক্ষামূলক চলাচল শেষ করতে বেশি সময় লাগবে।
উত্তরা থেকে কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রোরেল নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক মোহাম্মদ আব্দুল ওহাব প্রথম আলোকে বলেন, আগামী বছর এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে যাত্রী নিয়ে মেট্রোরেল কমলাপুরে যাবে—এমন প্রস্তুতি নিয়েই তাঁরা এগোচ্ছেন। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে জানুয়ারিতে পরীক্ষামূলক চলাচল শুরু হবে। তিনি বলেন, মতিঝিল থেকে কমলাপুর অংশের বাকি কাজ পুরোদমে চলছে।
দেশের প্রথম মেট্রোরেল
ঢাকার প্রথম মেট্রোরেলের উত্তরা থেকে আগারগাঁও অংশ চালু হয় ২০২২ সালের ২৮ ডিসেম্বর। পরের বছরের ৪ নভেম্বর চালু করা হয় আগারগাঁও থেকে মতিঝিল অংশের।
উত্তরা থেকে কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রোরেলের আনুষ্ঠানিক নাম এমআরটি লাইন-৬। উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত দূরত্ব ২০ দশমিক ১ কিলোমিটার। কমলাপুর পর্যন্ত দূরত্ব ২১ দশমিক ২৬ কিলোমিটার, অর্থাৎ বর্ধিত অংশের দূরত্ব ১ দশমিক ১৬ কিলোমিটার। উত্তরা থেকে কমলাপুর পর্যন্ত মোট স্টেশনসংখ্যা ১৭।
২০১২ সালে অনুমোদনের সময় মেট্রোরেল প্রকল্পের ব্যয় ছিল ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা। বর্তমানে ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা। জাপানের উন্নয়ন সহযোগী আন্তর্জাতিক সংস্থা জাইকার কাছ থেকে ১৯ হাজার ৭১৮ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে।
কমলাপুর পর্যন্ত চালু হলে মেট্রোরেলে দৈনিক যাত্রীসংখ্যা ৬ লাখ ৭৭ হাজারে উন্নীত হওয়ার আশা করা হচ্ছেডিএমটিসিএল সূত্র জানিয়েছে, ভবিষ্যতে উত্তরা থেকে টঙ্গী পর্যন্ত মেট্রোরেল সম্প্রসারণের পরিকল্পনা আছে। এতে দৈর্ঘ্য বাড়বে আরও সাড়ে সাত কিলোমিটার। নতুন করে স্টেশন নির্মাণ করা হবে আরও পাঁচটি। তবে এই বিষয়ে এখনো কোনো প্রকল্প নেওয়া হয়নি।
সরকার ঢাকায় ছয়টি মেট্রোরেল লাইন নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে। সবগুলোর দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ১৪০ কিলোমিটার। একটি মেট্রোরেল অন্যটির সঙ্গে সংযোগ তৈরি করে একটি মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক তৈরি হবে। ইতিমধ্যে কমলাপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত এবং সাভার থেকে গাবতলী, মিরপুর ও গুলশান হয়ে ভাটারা পর্যন্ত দুটি মেট্রোরেল নির্মাণ প্রকল্প চলমান আছে। গাবতলী থেকে মোহাম্মদপুর, কারওয়ানবাজার হয়ে দাশেরকান্দি পর্যন্ত আরেকটি মেট্রোরেল লাইন নির্মাণে প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বর্তমান বিএনপি সরকার মেট্রোরেলের সঙ্গে কয়েকটি মনোরেলের সংযোগ তৈরিরও পরিকল্পনা নিয়েছে।